বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি: সমন্বিত পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে করণীয় কী
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ইতিমধ্যে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা অনুসরণ করতে উপাচার্যদের অনুরোধ করেছেন।
আসন্ন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তি সামনে রেখে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এককভাবে পরীক্ষা নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। এ অবস্থায় সমন্বিত একক পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা রীতিমতো হুমকির মুখে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা না নিলে এত বছরের প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।
বিদ্যমান গুচ্ছ পদ্ধতির সমস্যা কী, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকেই শুনতে হবে। কারণ, কেবল ভর্তি পরীক্ষার অর্থ ভাগের সুবিধা পেতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি। সমন্বিতভাবে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করাও একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুরূহ ছিল। তা ছাড়া ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে ক্লাস শুরু করতেও দেরি হচ্ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একজন পরীক্ষার্থীর পেছনে তাঁর অভিভাবককে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। এর সঙ্গে থাকে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একেক জায়গায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ভোগান্তি। গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা সেই খরচ ও ভোগান্তি অনেকখানি কমিয়েছিল। গুচ্ছ পদ্ধতিতে একজন আবেদনকারী একটি পরীক্ষা দিয়েই তাঁর যোগ্যতা ও পছন্দের ক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ইতিমধ্যে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা অনুসরণ করতে উপাচার্যদের অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান না করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুচ্ছভুক্ত রাখা কঠিন হবে। এ বছরের ভর্তির ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি বহাল রাখার দাবিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।
গুচ্ছে না থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকখানি কমাতে পেরেছে। অন্যদিকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। পরে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারত। প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্বে রেখে সমন্বিত পদ্ধতির ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা করা যেতে পারে।
এরপরও যদি একক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হয়, তবে বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা তুলে দেওয়াই হতে পারে ভালো সমাধান। শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে থাকে। তার মানে হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আস্থা রাখতে পারে না। বাস্তবেও দেখা যায়, এসব পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভর্তি পরীক্ষাতেই পাস করতে পারেন না। গত এক দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকটি ইউনিটে পাসের হার ছিল ১০ শতাংশের আশপাশে। অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের শতকরা প্রায় ৯০ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ডে ভর্তির যোগ্যতা রাখেন না।
এ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল আরও গ্রহণযোগ্য করার জন্য দুই পরীক্ষকের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যায়। বর্তমানে একজন পরীক্ষার্থীর কোনো বিষয়ের খাতা একজন পরীক্ষকই মূল্যায়ন করে নম্বর দিয়ে থাকেন। সেই মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এখন যদি একটি খাতায় দুজন পরীক্ষক আলাদাভাবে নম্বর দেন এবং সেই নম্বরের গড় করে ফলাফল তৈরি করা হয়, তবে সেটি অধিক নির্ভরযোগ্য হতে পারে। বর্তমানে এসএসসি বা এইচএসসির খাতা দেখা ও ফলাফল তৈরির জন্য তিন মাসের মতো সময় লাগে। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে দ্বিগুণ সময় লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে ফল প্রকাশের সময় কমিয়ে আনা সম্ভব।
তা ছাড়া বর্তমানে ভর্তি পরীক্ষার কার্যক্রম শেষ করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরই কেবল বিবেচনা করা হলে ভর্তি পরীক্ষার দরুন মাত্রাতিরিক্ত সময় নষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এ দুটি পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পছন্দের ক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া যাবে। এরপরও শিক্ষার্থীদের মেধা বা যোগ্যতা নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকলে এসব পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন ও সমন্বয় কাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যুক্ত করে দেওয়া যায়।
● তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
Comments
Post a Comment